ইমাম আবু হানীফার প্রতি অভিযোগ করে বলা হয় যে, তিনি আল-ফিকহুল আকবার-এ বলেছেন, নিশ্চয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতামাতা জাহান্নামী বা জাহান্নামে যাবে। এটা বলা দূষণীয়। কারণ, এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কষ্ট পান।
এর উত্তর হল, ওয়াহবী সুলাইমান বলেন, আমি মদীনা মুনাওয়ারায় -সেখানে অবস্থানকারীর উপর সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক- শাইখুল ইসলাম আরেফ হেকমত পাঠাগারে আল-ফিকহুল আকবার-এর পাণ্ডুলিপিতে দেখেছি এবং তা পাঠ করেছি। কিন্তু সেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পিতামাতা কুফরের উপর মারা গিয়েছেন তা পাইনি। বরং সেখানে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতামাতা কুফরের উপর মারা যাননি। এই শব্দটিই প্রাধান্য পায়- আর এর অর্থ স্পষ্ট- অতঃপর তিনি বলেন, ‘আবু তালেব কাফের হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।’ যদি কুফরটি সকলেরই গুণ হত তাহলে তিনি -মাআযাল্লাহ বা আল্লাহর আশ্রয় চাই- বলতেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতামাতা ও আবু তালেব কুফরের উপর মারা গিয়েছেন। আর আল-ফিকহুল আকবার-এর কিছু সংখ্যায় যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতামাতা কুফরের প্রতি সম্পৃক্তকরণ পাওয়া যায়, তা প্রথম অনুলিপিকারী থেকে ভুল হয়েছে। অতঃপর অন্যান্য অনুলিপিকারীগণ তার অনুসরণ করেছেন। এর কারণ হল, অনুলিপিকারী নাÑবোধক শব্দ ‘মা’ কে দুই বার পেয়েছেন বা مَا مَاتَا -মা মাতা বা তারা দুইজন পিতামাতা মারা যান নি, এটাকে তিনি দুইবার পুনরাবৃত্তি মনে করে বিলুপ্ত করে দিয়েছেন। ফলে, বিবৃতি ভিন্ন হয়ে হয়েছে বা পিতামাতা কুফরের উপর মারা গিয়েছেন। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। [ইমাম যাহেদ আল-কাউসারী মনে করেন, মূল বিবৃতি হল, مَاتَا عَلَى الْفِطْرَةِ বা তারা -পিতামাতা- প্রকৃতির উপর মারা গিয়েছেন। আর এটাই নিকটবর্তী।]
অনেক অনুলিপিকারী পাণ্ডুললিপিতে লেখা খারাপ থাকা অথবা তার নিজের লেখা খারাপ থাকার কারণে অথবা যিনি কিতাব তাহকীক করেন তার ভাল জ্ঞান না থাকার কারণে অনেক মুদ্রিত কিতাবের বিবৃতিতে ভুল দেখা যায়।
আবু বকর ইবনুল আরাবীকে -তিনি মালেকী মাযহাবের একজন ইমাম- এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হল যে বলে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতামাতা জাহান্নামে। উত্তর দিলেন, যে ব্যক্তি এটা বলে সে অভিশপ্ত। আল্লাহ বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ يُؤْذُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ
-‘যারা আল্লাহ ও তার রাসূলকে কষ্ট দেয় আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে অভিশম্পাত করেন।’ [আল-আহযাবঃ ৫৭]
তিনি বলেন, এর চেয়ে আমি কোনো কিছু ধৃষ্টতা মনে করি না যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিত জাহান্নামী।
ইবনে আসাকের তার ইতিহাসে উল্লেখ করেন, ইয়াহইয়া বিন আব্দুল মালিক বিন আবু গনিয়্যাহ বলেন, আমাদেরকে নওফেল বিন আল-ফুরাত -তিনি উমর বিন আব্দুল আযীযÑএর প্রশাসক ছিলেন- বলেন, শামদেশের রচয়িতাদের মধ্যে থেকে এক ব্যক্তি তার কাছে বিশ্বস্ত ছিলেন। তিনি শাম শহরে একজন লোককে প্রশাসক নিযুক্ত করলেন যার পিতা মান্নানিয়া দ্বারা ওজন করত। এই সংবাদ উমর বিন আব্দুল আযীয-এর কাছে পৌঁছল। তিনি বললেন, কে আপনাকে মুসলমিদের অঞ্চলে এমন ব্যক্তিকে প্রশাসক নিযুক্ত করতে বলেছে যার পিতা মান্নানিয়া দ্বারা ওজন করত? তিনি বললেন, আমিরুল মো‘মিনীনকে আল্লাহ সঠিক করুন, তার পিতা কেমন ছিল সে দায়ভার আমার উপর নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতা মুশরিক ছিলেন। উমর বললেন, আহ! অতঃপর চুপ থাকলেন। অতঃপর মাথা উঠালেন এবং বললেন, আমি কি তার জিহ্বা কাটব? আমি কি তার হাত-পা কাটব? আমি কি তাকে ঘাড়ে আঘাত করব? অতঃপর তিনি বললেন, এটা কি আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সমতা করলেন? যতদিন জীবিত থাকবেন কোনো দায়িত্ব পাবে না। [তারিখে দেমশক, ইবনে আসাকের, ৪৫/২২২।]
আল-হাকেম একটি হাদিস বর্ণনা করেন যেটাকে তিনি সহিহ বলেছেন তবে যাহাবী একজন রাবি তথা ওসমানকে যয়ীফ বলেছেন। হাদিসটি হল, ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার পিতামাতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। তিনি বলেন, আমি আমার রবকে তাদের ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞাসা করিনি যে তিনি আমাকে তাদের ব্যাপারে কিছু দিবেন- আমি আমার রবকে তাদের ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞাসা করিনি যে, তিনি আমাকে দিবেন। তবে আমি সেদিন মাকাম মাহমুদ বা প্রশংসিত স্থানে অবস্থান করব। [আল-মুসতাদরাক, আলÑহাকেম, ২/৩৯৬, হাদিস নং ৩৩৮৫।]
এ হাদিসটিকে হাদিস বিশারদগণ উল্লেখ করেছেন এবং এটাকে সত্যায়ন করেছেন। বরং এর দ্বারা তারা পিতামাতার মুক্তির ব্যাপারে প্রমাণ দিয়েছেন। তারা হলেন, ইমাম সুহাইলী, সুয়ূতী এবং কিরাফী।
একটি হাদিস বর্ণনা করা হয়ে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতামাতাকে ঈমান আনয়নের জন্য জীবিত করা হয়। তারা ঈমান আনয়ন করেন এবং অতঃপর মৃত্যুবরণ করেন। তবে এটার ভিত্তি নেই। তবে সারকথা হল, তারা উভয়েই আহলে ফাতরার লোক ছিলেন। আর হাদিসে কুদসীতে আছে যে, চার প্রকার লোক হাশরের ময়দানে আল্লাহর কাছে আপত্তি করবে। তন্মধ্যে এক প্রকার হল আহলে ফাতরার লোক। হাদিসটি হলঃ আল-আসওয়াদ বিন সারী’ রাদ্বিয়াল্লাহ আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘চার প্রকার ব্যক্তিকে কিয়ামত দিবসে উপস্থিত করা হবে। একজন বধির যে কিছু শুনতে পেত না, দ্বিতীয়জন নির্বোধ বা পাগল, তৃতীয়জন বয়সের ভাড়ে ন্যুব্জ যে কিছু বুঝতে পারত না, চতুর্থজন যে ফাতরা বা মধ্যবর্তী বিরতীতে মারা গেছে -অর্থাৎ এক রাসূল বা নবীর মৃত্যুর পর অপর নবী বা রাসূল আসার আগ পর্যন্ত ইসলামের দাওয়াত না পেয়ে এবং সত্য জানতে না পেরে মারা গেছে। বধির বলবে, হে আমার রব! ইসলাম এসেছিল কিন্তু আমি কিছু শুনতে পেতাম না। নির্বোধ বা পাগল বলবে, হে আমার রব! ইসলাম এসেছিল কিন্তু বাচ্চারা আমার প্রতি পাথর, কংকর ও গোবর ইত্যাদি ছুঁড়ে মারত (ফলে ইসলাম সম্পর্কে আমি কিছু জানতে পরতাম না)। বয়সের ভারে ন্যুব্জ ব্যক্তি বলবে, হে আমার রব! ইসলাম এসেছিল অথচ আমি কিছুই বুঝতাম না। আর যে ব্যক্তি দুই নবী বা রাসূলের বিরতীতে মারা গেছে সে বলবে, হে আমার রব! আমার কাছে কোনো রাসূল আসেনি। তিনি তাদেরকে অনুসরণ করানোর জন্য তাদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নেবেন। অতঃপর তিনি তাদের কাছে নির্দেশ পাঠাবেন যে তোমরা জাহান্নামে প্রবেশ কর।’ তিনি (রাসূল) বলেন, ‘ঐ জাতের কসম যার হাতে মুহাম্মদের জান, যদি তারা জাহান্নামে প্রবেশ করে তাহলে তারা তা শীতল ও শান্তিময় পাবে।’ [মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং ১৬৩৪৩।]
হাদিসটির সনদ যয়ীফ, তবে হাদিসটি হাসান। কেননা, হাদিসটির কিছু শাহেদ আছে যা শায়খ নাসের উদ্দীন আলবানী সিলসিলা সহিহায় ১৪৩৪ নং এ উল্লেখ করেছেন। সুতরাং, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতামাতা ও দাদা যেহেতু ফাতরা বা দুই নবীর মধ্যবর্তী সময়ে মারা গেছেন, তাহলে তারা পরকালে সুযোগ পাবেন।
তবে সহিহ মুসলিম একটি হাদিস বর্ণনা করেন, যেখানে আছে, এক ব্যক্তি এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে রাসূলুল্লাহ, আমার পিতা কোথায়? তিনি বললেন, জাহান্নামে। তিনি যখন পশ্চাদ্ধাবন করলেন, তিনি বা রাসূলুল্লাহ বললেন, আমার পিতা এবং তোমার পিতা জাহান্নামে। [সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২০৩/৩৪৭।]
এ হাদিসটি উপরোক্ত হাদিসের সাথে সাংঘর্ষিক হচ্ছে। এর উত্তরে বলা যায়, এ হাদিসটি তিনি যখন বলেছেন হয়তো তখন বা তার আগে আল্লাহ তাঁকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জানাননি যে আহলে ফাতরার ব্যাপারে কী করা হবে। পরে আল্লাহ তাকে জানিয়েছেন যে পরকালে তাদেরকে সুযোগ দেয়া হবে। অথবা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম তার পিতা জাহান্নামী বলার আরেকটি কারণ হতে পারে যে, তিনি যখন আল্লাহর কাছে তার পিতার জন্য ইসতেগফার করার অনুমতি চেয়েছিলেন, আল্লাহ তাকে অনুমতি দেননি। এ কারণে, তিনি ধারণা করেছেন তার পিতা জাহান্নামী। আবার, এটাকে অনেকে প্রমাণ উপস্থাপন করেন যে, তাঁর পিতা মুশরিক ছিলেন।
এখানে একটি প্রশ্ন আসতে পারে, আল্লাহ কেন তাকে তার পিতার জন্য ইসতেগফার করতে দেননি? এর উত্তরে বলা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইসতেগফার করবেন নিজের জন্য এবং তাঁর উম্মতদের জন্য। তবে যারা তারা উম্মত নয় তাদের জন্য তিনি ইসতেগফার করবেন না এবং পরকালে তার উম্মত ব্যতীত অন্য একত্ববাদীদেরকে জাহান্নামে দেখলেও তাদের জন্য সুপারিশ করতে পারবেন না। কারণ, তিনি সুপারিশ করতে যাচনা করবেন তবে আল্লাহ তাকে তার অনুমতি দিবেন না। বরং তিনি বলবেন, এটা তোমার প্রতি নয়। তারা আমার একত্ববাদের প্রতি ঈমান এনেছে। আমিই তাদেরকে মুক্তি দিব। যেমন হাদিসে কুদসীর শেষাংশে বর্ণিত হয়েছেঃ …‘অতঃপর আমি চতুর্থবার ফিরব এবং উক্ত বাক্য দ্বারা তার প্রশংসা করব। অতঃপর তার সেজদায় লুটিয়ে পড়ব। বলা হবে, হে মুহাম্মদ! মাথা উঠাও। বল, শোনা হবে। চাও, দেয়া হবে। সুপারিশ কর, কবুল করা হবে। আমি বলব, হে আমার রব! যারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলেছে তাদের ব্যাপারে আমাকে অনুমতি দিন। তিনি বলবেন, আমার ইজ্জত, বড়ত্ব, মহত্ত¡ ও সম্মানের কসম! যে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলেছে অবশ্যই আমি তাকে বের করব।’[সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৭০৭২, ও সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৩২৬-১৯৩।]
অর্থাৎ-“আমার ইজ্জত, বড়ত্ব, মহত্ত¡ ও সম্মানের কসম! যে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলেছে অবশ্যই আমি তাকে বের করব” – এ অংশটুকু দ্বারা এটা স্পষ্ট যে যাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেনি, ইসলাম সম্বন্ধে কিছু জানে না তবে প্রকৃতিকে গবেষণা করে এতটুকু বুঝতে সক্ষম হয়েছেন যে, এ নিখিল বিশ্বের কোনো স্রষ্টা আছে। মৃত্যু অবধি সে এ বিশ্বাসেই অটল ছিল এবং একত্ববাদের ওপর তার মৃত্যু হয়েছে তাহলে কিয়ামত দিবসে স্বয়ং আল্লাহ তাকে মুক্তি দেবেন এবং এদের জাহান্নাম থেকে বের করার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো কর্তৃত্ব থাকবে না। [সহিহ হাদিসে কুদসী, কামারুজ্জামান বিন আব্দুল মালেক, পৃষ্ঠা ১১৩।]
আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূর্বপুরুষগণের ব্যাপারে অনেকে বলেন যে, তারা কেউ মুশরিক ছিলেন না। তারা একত্ববাদের বিশ্বাসী ছিলেন। যেমন ইমাম রাযী বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আমি পবিত্র পিঠ থেকে পবিত্র জঠরে স্থানান্তরিত হয়ে আসছিলাম।’ আর আল্লাহ বলেন,
إِنَّمَا الْمُشْرِكُونَ نَجَسٌ
-‘মুশরিকরা নাপাক।’ [তওবাঃ ২৮] এটা অত্যাবশ্যক করে যে, তাঁর দাদা ও নানাদের পূর্বপুরুষ মুশরিক ছিলেন না।’[তাফসীর রাযী, ১৩/৩৩।]
হাদিসটি হল, ইকরিমা থেকে বর্ণিত, ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আমার পিতামাতা অনৈতিক কাজে লিপ্ত হয়নি। আর আল্লাহ আমাকে পবিত্র পৃষ্ঠ থেকে পবিত্র জঠরে স্বচ্ছ ও শৃঙ্খলিত অবস্থায় পরিবর্তন করে এনেছেন। আর যখন শাখা-প্রশাখা হয়েছে, আমি উত্তম শাখায় থেকেছি।’[দালায়েলুন নবুওয়াহ, আবু নুয়াইম আল-ইসপাহানী, ১/১১Ñ১২।]
তবে এই হাদিসটির সনদের ব্যাপারে নাসিরুদ্দীন আলবানী বলেন, ‘দুর্বল। আর ইকরিমার পরে যারা আছে তাদেরকে আমি চিনি না।’ [এরওয়াউল গালীল, নাসিরুদ্দীন আলবানী, ৬/৩৩১Ñ৩৩২।]
ইমাম শওকানী বলেন, ‘এটা মওদ্বু বা জাল। এটাকে ঘটনা বর্ণনাকারীরা বানিয়েছে।’[আল-ফাওয়ায়েদুল মাজমুআ‘হ, ইমাম শওকানী, পৃষ্ঠা ৩২০।]
সুতরাং, এ হাদিসটিকেও প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না। আর দুই ফাতরার মধ্যবর্তী সময়ে যারা মারা গিয়েছে তাদের মধ্যে যাদের কাছে ইবরাহীমী দাওয়াত পৌঁছেছে তারপরও তারা মূর্তিপূজা ও শিরকে লিপ্ত ছিল তারা জাহান্নামে যাবে। আর যাদের কাছে ইবরাহীমী দাওয়াত পৌঁছেনি এবং তারা একত্ববাদের বিশ্বাসেও অটল থাকেনি বরং শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে নানা শিরকযুক্ত কাজে লিপ্ত হয়েছে, এরা পরকালে দাবি উত্থাপন করতে পারবে যে, তাদের কাছে দাওয়াত পৌঁছেনি। ফলে, তাদেরকে কিয়ামত দিবসে জাহান্নামে ঝাঁপ দিতে বলা হবে। তবে মক্কায় ইবরাহীমী দাওয়াত বলবৎ থাকার সম্ভাবনা শতভাগ। কারণ, সেখানে ইসমাঈল আলাহিস সালাম ও তার পুত্রদের বসবাস চলে আসছিল। আর তারা বংশ পরম্পরায় সেখানে ইবরাহীমী দাওয়াতকে চলমান রেখে থাকবেন সেটাই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত। কারণ, যেহেতু লোকেরা বিভিন্ন স্থান থেকে মক্কায় হজ্জ করতে আসতেন। তবে লোকদের মাঝে শয়তান মূর্তিপূজা প্রবেশ করিয়ে দিয়েছিল। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে ইসলাম আগমনের পূর্বে মক্কায় বসবাসকারী যারা মূর্তিপূজায় লিপ্ত ছিল তারা পরকালে আপত্তি করার সুযোগ পাবে না। আবার, এমনও হতে পারে যে, লোকেরা মক্কায় হজ্জ করতে আসত বটে তবে কালের আবর্তনে শয়তান তাদের মাঝে একত্ববাদের শিক্ষা নিষ্প্রভ করে তাদের মাঝে মূর্তিপূজা প্রবেশ করিয়েছিল। সূতরাং, এই দুইটি অবস্থার মধ্যে যদি মূর্তিপূজা প্রচলিত থাকা সত্তে¡ও একত্ববাদের দাওয়াত অবশিষ্ট থেকে থাকে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতামাতা ও পূর্বপুরুষগণ একত্ববাদে বিশ্বাসী হয়ে থাকেন তাহলে তারা মুক্তি পাবেন। আর যদি সমাজ থেকে একত্ববাদের বিশ্বাস অপসারিত হয়ে থাকে এবং তারা বংশ পরম্পরায় একত্ববাদে বিশ্বাসী ছিলেন এবং মূর্তিপূজা করতেন না, তাহলেও তারা মুক্তি পাবেন। আর যদি একত্ববাদের বিশ্বাস নিষ্প্রভ হয়ে থাকে এবং তারা মূর্তিপূজায় লিপ্ত থেকে থাকেন তাহলে পরকালে তারা আহলে ফাতরা হিসেবে আপত্তি জানাতে পারবেন। কারণ, আল্লাহ তায়ালা রাসূল প্রেরণ করা ব্যতীত কোনো জাতিকে শাস্তি দেন না। যেমন তিনি বলেন,
وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولًا
-‘আর আমরা শাস্তি প্রদানকারী নই যতক্ষণ না আমরা রাসূল প্রেরণ করি।’ [আল-ইসরাঃ ১৫]।
তবে ইমামিয়াদের মত হল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূর্বপুরুষগণ একত্ববাদে বিশ্বাসী ছিলেন। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।